তারকা অনেকেই হন, কিংবদন্তি হন অল্প কয়েকজন। বক্স অফিসের সাফল্য, ভক্তের উন্মাদনা কিংবা সাময়িক জনপ্রিয়তা—এসব দিয়ে একজন অভিনেতার স্থায়িত্ব মাপা যায় না। যাদের অভিনয় এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রভাব ফেলে, যাদের কাজ চলচ্চিত্রের ভাষাই বদলে দেয়—তাদেরই বলা যায় সত্যিকারের চিরস্মরণীয় নায়ক।
নিরপেক্ষ বিবেচনায়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব, অভিনয়ের বৈপ্লবিক ধারা এবং দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বিচার করে এমন দশজন নায়কের কথা তুলে ধরা হলো।
১. চার্লি চ্যাপলিন
নীরব চলচ্চিত্র যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মুখ। সংলাপ ছাড়াই কেবল অভিব্যক্তি ও শরীরী ভাষায় বিশ্বকে হাসিয়েছেন, কাঁদিয়েছেন। তার সৃষ্ট ‘ট্র্যাম্প’ চরিত্রটি সিনেমা ইতিহাসের অন্যতম প্রতীক।
২. উত্তম কুমার
বাংলা চলচ্চিত্রে রোমান্টিক নায়কের সংজ্ঞাই বদলে দেন। অভিনয়ের স্বাভাবিকতা এবং ক্যামেরার সামনে অদ্ভুত স্বাচ্ছন্দ্য তাকে “মহানায়ক” উপাধি এনে দেয়। আজও বাংলা সিনেমার মানদণ্ড হিসেবে তার নাম উচ্চারিত হয়।
৩. রাজ্জাক
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে পুনর্গঠনে তার ভূমিকা ঐতিহাসিক। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতা তাকে দেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে স্থায়ী আসন দিয়েছে।
৪. দিলীপ কুমার
বলিউডে ‘ট্র্যাজেডি কিং’ নামে পরিচিত। আবেগঘন অভিনয়ের নতুন ধারা প্রতিষ্ঠা করেন। তার অভিনয়শৈলী পরবর্তী প্রজন্মের অভিনেতাদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
৫. অমিতাব বচ্চন :
১৯৭০-এর দশকে ‘অ্যাংরি ইয়াং ম্যান’ চরিত্রের মাধ্যমে ভারতীয় মূলধারার সিনেমায় সামাজিক বাস্তবতার নতুন ভাষা নিয়ে আসেন। কয়েক দশক ধরে প্রাসঙ্গিক থাকা তার বিরল অর্জন।
৬. হামফ্রি বোগার্ট:
হলিউডের স্বর্ণযুগের অন্যতম শক্তিশালী উপস্থিতি। সংযত অভিনয় ও ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্ব তাকে ক্লাসিক আমেরিকান নায়কের প্রতীক বানিয়েছে।
৭. মার্লোন ব্র্যান্ডো:
মেথড অ্যাক্টিংকে মূলধারায় প্রতিষ্ঠা করেন। চরিত্রের ভেতরে সম্পূর্ণভাবে ঢুকে যাওয়ার ক্ষমতা অভিনয়ের ব্যাকরণ বদলে দেয়। আধুনিক বাস্তবধর্মী অভিনয়ের অন্যতম পথিকৃৎ।
৮. আল পাচিনো:
তীব্র আবেগ, গভীর সংলাপ উপস্থাপন এবং শক্তিশালী চরিত্রায়ণে বিশ্বজুড়ে খ্যাত। অপরাধভিত্তিক ও মনস্তাত্ত্বিক চরিত্রে অভিনয়ের নতুন মাত্রা যোগ করেছেন।
৯. শাহরুখ খান:
রোমান্টিক নায়কের আধুনিক রূপ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বিশ্বব্যাপী ভারতীয় সিনেমার জনপ্রিয়তা বিস্তারে তার অবদান অনস্বীকার্য।
১০. সালমান শাহ:
সংক্ষিপ্ত ক্যারিয়ার হলেও নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের তরুণ সমাজে সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার করেন। স্টাইল, উপস্থাপনা ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় তিনি একটি প্রজন্মের প্রতীক হয়ে ওঠেন।
চিরস্মরণীয় হওয়ার মানদণ্ড কী?
চিরস্মরণীয় হওয়া মানে কেবল জনপ্রিয় থাকা নয়। এর মানে—
অভিনয়ের ভাষায় পরিবর্তন আনা
সাংস্কৃতিক প্রভাব সৃষ্টি করা
সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকা
পরবর্তী প্রজন্মকে প্রভাবিত করা
এই তালিকার নায়কেরা সেই মানদণ্ডে উত্তীর্ণ। কেউ প্রযুক্তিগত অভিনয়শৈলী বদলেছেন, কেউ সামাজিক বাস্তবতাকে পর্দায় তুলে এনেছেন, কেউ আবার একটি জাতির আবেগের প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
তারকারা সময়ের সঙ্গে বদলায়। কিন্তু ইতিহাসে জায়গা করে নেওয়া নায়করা থেকে যান—চলচ্চিত্রের আলো-আঁধারিতে, দর্শকের স্মৃতিতে, আর শিল্পের বিবর্তনের পাতায়।